সোহেল মাহমুদ সাগর
“সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি। আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে, আমি যেন সেই কাজ করি ভালো মনে“
“পাখি সব করে রব রাতি পোহাইলো, কাননে কুসুমকলি সকলি ফুটিল ……..“
“অসৎ সংঘ ত্যাগ করো, আলস্য দোষের আকর, ইক্ষুর রস অতি মিষ্ট,
উর্ধ্ব মুখে পথ চলিও না, ঋষি বাক্য শিরো ধার্য …….“
‘মা, মাতৃভূমি ও মাতৃভাষা’ -এ ত্রিভুজে যুগে যুগে বিদ্যানিধিদের এসব প্রবচন কেবলই এখন কথার কথা! আজকের বাস্তবতায় মানুষজন নিজেদেরকে এসবের চর্চায় ফিরিয়ে আনা খুবই জরুরি। আর এ জন্যে প্রয়োজন সংস্কারের।মান্যবর প্রধান অতিথি -এদেশের স্বনামধন্য ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, বিশেষ অতিথিবৃন্দ, দূরদূরান্ত থেকে আগত মহাসাদাখাতার অভিলাষী পাঠক-সাথি, ভদ্রমহিলা, ভদ্রলোক এবং সাংবাদিকবৃন্দ অনুষ্ঠানে আপনাদের সবাইকে সুস্বাগতম জানাই। আপনাদের আগমন সুখদ ও স্বাচ্ছন্দ্যকর হোক।
সুধীজন, “থিয়োসফি – নাম থেকেই বোঝা যাচ্ছে এটা কোনো সাধারণ বই নয়। লেখক সোহেল মাহমুদ সাগরের প্রথম বই এটি। লেখক একজন উন্নয়ন কর্মী ও গবেষক। লেখালেখিতে নতুন হলেও তিনি জীবন এবং জগৎকে দেখেছেন নানা দিক থেকে, নানা মাত্রায়। তার দৃষ্টি শুধু প্রসারিত নয়, দেখার ভঙ্গিও গতানুগতিকতার বাইরে। নিজের জীবনঅভিজ্ঞতার ভান্ডার সমৃদ্ধ হওয়ায় বইয়ে তার প্রতিফলন ঘটেছে পাতায় পাতায়। বইটি আগাগোড়া পড়ে আমি মুগ্ধ হয়েছি। এতে এমন অনেক কিছু আছে যা আমি আগে জানতাম না। আমি আশা করি, পাঠকরাও থিয়োসফি পড়ে বঞ্চিত বোধ করবেন না।” – এ উক্তি থিয়োসফি গ্রন্থের সম্পাদক, এদেশের সাহিত্য অঙ্গনে অতিশয় ধীমানদের একজন, সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, প্রিয়ভাষী বিভুরঞ্জন সরকার-জির। এর পর ‘থিয়োসফি’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে আমার বলার সুযোগও সীমিত হয়ে যায় বইকি। তয় ‘থিয়োসফি’ গ্রন্থের লেখক বা প্রবন্ধকার হিসেবে কিছু কথা বলার আকাঙ্খা আমি অবদমন করি কী করে..!!
সম্মানিত অতিথি এবং সামনে উপবিষ্ট মহাসাদাখাতার পাঠক-সাথিগণ আমার.! আমি এখানে নতুন করে কিছু না বলে বরং আমার সংকলন গ্রন্থ ‘থিয়োসফি’ থেকেই কিছু কথা কোড বা আনকোড করছি কেবল :
১. গেল বছরব্যাপি (নভেম্বর ২০১৬-২০১৭ খ্রি.) মহাসাদাখাতায় (ফেসবুক) আমার ওয়ালে মোট ১০৩টি প্রবন্ধ আমি সেঁটে দিয়েছি। মহাসাদাখাতা আমার দেয়া ফেসবুকের অলীক নাম। প্রারম্ভে ভাবনায় না থাকলেও সাথিদের (ফেসবুক ফ্রেণ্ডস) বলাবলিতে মহাসাদাখাতায় প্রকাশিত প্রবন্ধগুলোর একটি সংকলন তৈরিতে উৎসুক হই। পরিণামে ‘থিয়োসফি’ নামকরণ করে এই গ্রন্থ পাঠকদের উদ্দেশ্যেই আমার নিবেদন। গ্রন্থটির নামকরণে গবেষণালব্ধ জ্ঞান আমাকে যারপরনাই প্রভাবিত করেছে। কেননা এই মহাবিশ্ব মূলত উদ্ভিদ ও প্রাণীজগৎ নিয়েই সৃষ্ট। আর উদ্ভিদ ও প্রাণী পরস্পরকে কার্বন ও অক্সিজেন সরবরাহ এবং খাদ্য যোগানে নিরলসভাবে ব্যতিব্যস্ত। কিন্তু আজকের পরিবেশ প্রতিবেশে মানুষ পরস্পরের মাঝে কেবল স্বার্থের হানাহানি বিরাজমান। কারণ মূলত চক্ষুকর্ণ কিংবা ইন্দ্রিয়ের দ্বারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে মানুষজনের বসবাস। তাতে সঠিকের চেয়ে বেঠিক সিদ্ধান্তের ডামাডোল সবসময়ে। বস্তুত প্রকৃতির (প্রাণী-উদ্ভিদ জীবসত্ত্বার মধ্যেকার খাদ্য গ্রহণ, সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার) ভারসাম্য রক্ষা হচ্ছে না। বিদ্যানিধিদের মতে, ‘চক্ষুকর্ণ কিংবা ইন্দ্রিয়ের অগোচরে যে জ্ঞান তাই তো দিব্যজ্ঞান, অতীন্দ্রিয় জ্ঞান বা থিয়োসফি’। তয় এই জ্ঞান মানুষ মাত্রই নিজের মধ্যে সুপ্ত অবস্থায় বিরাজমান থাকে, যা নিত্য জানাশোনায় চর্চা করার মাধ্যমেই কেবল প্রকৃতি নামক জগৎ অর্থাৎ জীবাত্মা এবং পরমাত্মার সান্নিধ্য লাভসহ জগৎসংসারের কাজে সঠিকতায় উপনীত হওয়া সহজবোধ্য ও সহজসাধ্য হয়।
{আমার গবেষণা কর্মের বিষয়বস্তু ‘অ্যানথ্রোপোসফিকাল মেডিসিন’। তয় এটি আজকালের কোনো বীমা কোম্পানি, ওষুধ কোম্পানি কিংবা চিকিৎসা প্রযুক্তি নির্মাণ কারখানার মালিকদের কাজ নয়। কেননা প্রচলিত চিকিৎসাব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষোভ শুধু রোগীদেরই নয়, চিকিৎসাদানকারী বহু কর্মীরও। আজকে চিকিৎসাবিজ্ঞান সম্পর্কে রোগীদের ভ্রান্ত ধারণায় সুস্বাস্থ্য কিংবা নিরাময়ের জন্য ডাক্তার, ড্রাগস্টোর বা হাসপাতাল রয়েছে। আর ডাক্তার তাদেরকে ধন্বন্তরী ট্যাবলেট, ক্যাপসুল কিংবা ইনজেকশন দিয়ে ভালো করে দেবেন। এই আশায় রোগীরা ডাক্তারের পর ডাক্তার, আর ওষুধের পর ওষুধ বদলাচ্ছে। কিন্তু তাতে সাময়িক প্রশমন হলেও প্রকৃত অর্থে রোগভোগের নিরাময় লাভ হচ্ছে না। সেদিক থেকে অ্যানথ্রোপোসফিকাল মেডিসিনের নির্ভরতা কেবলই প্রকৃতিজ উৎসে। এটি রাসায়নিক কিংবা বিষ মিশিয়ে তৈরি করা ধন্বন্তরী কোনো ওষুধ বা চিকিৎসাব্যবস্থা নয়। যদিও এর নামের শেষে মেডিসিন শব্দটি যুক্ত, তয় এতে বিভ্রান্ত হওয়ার কোনো কারণ নাই। আসলে এটি সম্পূর্ণভাবে উদ্ভিদ, তৃণলতা, পল্লব, ছাল-বাকল, মূল-শিকড়, ফুল, ফল ও শস্যদানা সরাসরি খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করার কথাই বলছে। কেননা স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের আদি কথাই হচ্ছে, ‘বেস্ট ফুড ইজ দ্যা বেস্ট মেডিসিন’। অথচ প্রকৃতির আদি সকল ব্যবস্থাই মানুষজন আজ প্রায় বিসর্জণ দিয়ে বসে আছে। অনেকটা নিজেরে হারিয়ে খোঁজার মতো অবস্থা আর কী..!! }
আমার সিএ ছাত্রাবস্থায় রাজশাহী মিশন হাসপাতালের অডিট কাজে সেখানে যাই। কোনো এক বিকালে গেষ্টহাউজে গল্পসল্পের মাঝে ওখানকার এক ডাক্তারের অমোঘ একটি ধাঁধার মুখোমুখি হই। প্রাসঙ্গিকতা থাকায় সারসংক্ষেপে তা বলছি আপনাদের। ডাক্তার: বাঘের আয়ু বেশি নাকি হাতির! আমি: বোধ করি হাতির! ডাক্তার: কেন! আমি: প্রাকৃতিক কারণে হয়তো! ডাক্তার: বাঘের আয়ু গড়পড়তায় ২৫, আর হাতির ১০০ বছর। কেননা হাতি তৃণভোজী, আর বাঘ মাংসভোজী। এটি প্রায় চল্লিশ বছর আগের কথা। কিন্তু আজও এটি স্পষ্ট আমার অনুভবে, কারণ বাস্তবতায় সদা এর মিল খুঁজে পাই বলে।
সুধীজন, আমি বেশি সময় নেবো না কিংবা আপনাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করবো না, বরং জীবনধর্মী এই কথাগুলো একটু মনযোগ দিয়ে শুনার আকুল আবেদন করছি এই জন্য যে, আজ এই অনুষ্ঠানে আমার কথাগুলো নতুন কোনো বিষয় নয়, বরং নিরেট এ বিষয়বস্তু জানাশোনায় আপনার এবং আপনার মাধ্যমে এই জগদবাসী সঠিকভাবে জেনেশুনে উপকৃত হবেন এটা আমি নিশ্চিত করেই বলতে পারি। এখন দেখা যাক চিকিৎসাব্যবস্থা সম্পর্কে বিশ্বের রাঘববোয়াল সব চিকিৎসাবিজ্ঞানীগণ কী বলছেন..!!
২. ৬০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকোর ডা. মেয়ার ফ্রেডম্যান এবং ডা. রে রোজেনম্যান দীর্ঘ গবেষণার পর দেখান যে, হৃদরোগের সাথে অস্থিরচিত্ততা, বিদ্বেষ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা জীবনপদ্ধতির সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। মন যখন ভাবাবেগজনিত চাপ কিংবা উৎকণ্ঠার সম্মুখীন হয় তখন শরীর নানাভাবে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে -এটি হার্ভার্ডের ফিজিওলজিস্ট ওয়াল্টার ক্যানন একশত বছর আগেই গবেষণার মাধ্যমে দেখিয়েছেন। রক্তে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক উপাদান নিঃসরণের পাশাপাশি হৃদকম্পন বেড়ে যায়, রক্তচাপ বেড়ে যায়, মলাশয়ের তৎপরতা বাড়ে, মূত্রাশয় সহজে সংকুচিত হয়। ডা. হার্বার্ট বেনসন এবং ডা. এডমন্ড জ্যাকবসন এই টেনশন বা উৎকণ্ঠার কারণে সৃষ্ট রোগের দীর্ঘ তালিকা তৈরি করেছেন। এই তালিকায় রয়েছে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা, বাতব্যথা, বিষণ্ণতা, বদমেজাজ, উদরাময়, গ্যাস্ট্রিক আলসার, বহুমূত্র, ঘাড়ে ও মেরুদণ্ডে ব্যথা প্রভৃতি। ড. জোসেফ মার্কোলা তার টোটাল হেলথ প্রোগ্রাম বইয়ে দেখিয়েছেন, প্রতিবছর শুধু আমেরিকাতেই স্ট্রেসঘটিত শারীরিক, মানসিক জটিলতার কারণে ৩০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়। রোগ এবং অসুস্থতা থেকে মুক্তির জন্যে প্রথম প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গি বা জীবন চেতনার পরিবর্তন। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে, শতকরা ৭০ ভাগ রোগের কারণই হচ্ছে মানসিক। অর্থাৎ কোনো ঘটনার প্রেক্ষিতে মানুষজনের মানসিক প্রতিক্রিয়াই ৭০ শতাংশ রোগ সৃষ্টির কারণ। শতকরা ২০ ভাগ রোগের কারণ হচ্ছে ইনফেকশন, ভাইরাস আক্রমণ, ভুল খাদ্য গ্রহণ ও ব্যায়াম না করা। শতকরা ১০ ভাগ রোগের কারণ হচ্ছে দৈহিক আঘাত, ওষুধ ও অপারেশনের প্রতিক্রিয়া। তাই ৭০ শতাংশ রোগই শুধুমাত্র দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে সুস্থ জীবনদৃষ্টি গ্রহণের মাধ্যমে নিরাময় হতে পারে। অন্যান্য রোগ নিরাময়েও ওষুধ এবং সার্জারির পাশাপাশি সুস্থ জীবনদৃষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি হিসেবে প্রচলিত পাশ্চাত্য চিকিৎসা পদ্ধতি মূলত ওষুধ, রসায়ন, এবং অপারেশন নির্ভর পদ্ধতি। আলোড়ন সৃষ্টিকারী কোয়ান্টাম হিলিং-এর প্রবক্তা ডা. দীপক চোপড়া বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে রোগীরা এক আক্রমণাত্মক যান্ত্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থার শিকার। চিকিৎসা ব্যবস্থার এ যান্ত্রিকতাই যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর শতকরা ৩৬ ভাগ মৃত্যুর জন্যে দায়ী। একটি মার্কিন সাময়িকীর বিশেষ নিবন্ধে বলা হয়, যান্ত্রিক ও রসায়ন নির্ভর এ চিকিৎসা ব্যবস্থা এখন হয়ে উঠেছে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। চিকিৎসাব্যবস্থা প্রকৃত অর্থেই এখন হয়ে উঠেছে ‘চিকিৎসাব্যবসা’ কিংবা ‘চিকিৎসাবাজার’। আর এসব বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে বীমা কোম্পানি, ওষুধ কোম্পানি, এবং চিকিৎসা প্রযুক্তি নির্মাণ কারখানার মালিকেরা। ফলত এ চিকিৎসাব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষোভ শুধু রোগীদেরই নয়, চিকিৎসাদানকারী বহু কর্মীরও। ডা. জন রবিন্স এ অবস্থার জন্যে চিকিৎসাবিজ্ঞান সম্পর্কে রোগীদের ভ্রান্ত ধারণাকেও দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, “এরা মনে করে যে সুস্বাস্থ্য বা নিরাময় ডাক্তার, ড্রাগস্টোর বা হাসপাতালে রয়েছে। ডাক্তার তাদেরকে ধন্বন্তরী ট্যাবলেট, ক্যাপসুল বা ইনজেকশন দিয়ে ভালো করে দেবেন। এ আশায় রোগীরা ডাক্তারের পর ডাক্তার, আর ওষুধের পর ওষুধ বদলায়। কিন্তু নিরাময় লাভ করতে ব্যর্থ হয়।” ডা. রবিন্স আরো বলেন, “আসলে নিরাময়ের ক্ষমতা, রোগ মুক্তির ক্ষমতা রোগীর মধ্যেই রয়েছে। ডাক্তার শুধু সহায়ক শক্তি মাত্র।” নব্য চিকিৎসাধারার প্রবর্তক ডা. ডীন অরনিশ, ডা. দীপক চোপড়া, ডা. ল্যারী ডসি, ডা. রবিন্স, ডা. বার্নি সীজেল, ডা. ক্রিশ্চিয়ানে নর্থট্রপ, ডা. হার্বার্ট বেনসন, ডা. জোয়ান বরিসেঙ্কো, ডা. এন্ড্রু ওয়েলস, ডা. এডওয়ার্ড টাওব, ডা. মিখাইল স্যামুয়েলস প্রমুখ বডি-মাইন্ড-স্পিরিট সাময়িকীর ১৯৯৭ সালের বিশেষ সংখ্যায় একবিংশ শতকের স্বাস্থ্য প্রচ্ছদ কাহিনিতে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে মত প্রকাশ করেছেন যে, “সুস্থ থাকতে হলে নিজের স্বাস্থ্যের দায়িত্ব নিজেকেই গ্রহণ করতে হবে। নিজেকে নিরাময় করার ক্ষমতা প্রতিটি মানুষের সহজাত ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত। এই সহজাত ক্ষমতার সাথে নিজের বিশ্বাসকে সম্পৃক্ত করতে পারলে প্রচলিত চিকিৎসাব্যবস্থার শতকরা ৯০ ভাগ খরচই অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়বে। কারণ বাইপাস সার্জারি, এনজিওপ্লাস্টি বা সারাজীবন কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রক ওষুধ সেবনের চাইতে জীবনদৃষ্টি বদলিয়ে জীবনধারা পরিবর্তনে খরচ অনেক অনেক কম।”
৩. বহুগুণের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে বেলগাছ রোপণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেই। বরং দিন দিন এই গাছ ক্রমান্বয়ে বিলুপ্তির পথে। মনে রাখা বাঞ্ছনীয় যে, বৃক্ষ ও পরিবেশ রক্ষা মানবজীবনের অস্তিত্বের জন্যে অত্যন্ত জরুরি। তাই আমাদের পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখা এবং নানারকম রোগের চিকিৎসার জন্যে যার যতটুকু জায়গা আছে, সেখানেই সুপরিকল্পিতভাবে ওষুধি গুণসম্পন্ন বেল গাছ রোপণ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে, তা হবে অতীব আবশ্যিক একটি পদক্ষেপ। ফলে এদেশের ধনী-গরিবের স্বাস্থ্য রক্ষায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখার ধারাবাহিকতাও বজায় থাকবে।
৪. ইদানীংকালে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীদের অমোঘ উক্তি, ‘Best Food is the Best Medicine’। অর্থাৎ ভালো খাবারই ভালো ওষুধ। ভিটামিন ও ভেষজ গুণে যুগলবন্দি খাবার এই ধরায় অনেকই আছে। তয় আর্ন্তজাতিকভাবে খ্যাত এরকম যুগলবন্দি গুণে গুণান্বিত খাবার বলতে সাধারণ মানুষজনের নিকট অতি পরিচিত হচ্ছে আপেল। প্রতিদিন একটি করে আপেল খেলে ডাক্তারের রুটিরুজি নাকি বন্ধ হয়ে যাবে। ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দে এমন একটি বচনের প্রচলন ঘটে। ডাক্তারদের মনে ভয়ভীতি কিছু আছে বলে কিন্তু মনে হয় না। প্রায় ১৩১ বছর পর এখনো ঘুরেফিরে ডাক্তাররা খানিক সে কথারই পুনরাবৃত্তি করছেন। মার্কিন মুল্লুকে সেই সময় আপেলের মতো পেয়ারার প্রচলন বোধ করি ছিল না। নইলে এই ফল নিয়ে আরেকটি সরেস কোনো মন্তব্য নিশ্চয় তাঁরা করতেন। আপেল হোক আর পেয়ারা, দুটি ফলে খাদ্য উপাদান একই। তয় পার্থক্যটা উপাদানের পরিমাণে। পুষ্টিগুণের বিচারে আপেলের চেয়ে পেয়ারা সে জন্যেই এগিয়ে আছে বলে জানালেন বারডেম জেনারেল হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ পুষ্টি এবং পথ্যবিদ শামসুন্নাহার নাহিদ। ‘কাঠবেড়ালী কাঠবেড়ালী পেয়ারা তুমি খাও’ কবি নজরুল-জির কবিতা থেকে কাঠবেড়ালীর সাথে পরিচয় না থাকলেও পেয়ারার সাথে মানুষজনের পরিচয় শৈশব থেকেই। কারো কারো দুরন্ত শৈশব কেটেছে পেয়ারা গাছের ডালে দোল খেয়ে। এছাড়া উপাদেয় খাদ্য হিসেবে মোটের ওপর পেয়ারার তুলনা হয় না অন্য কোনো খাদ্যাখাদ্যের সাথে। ঠিক যেন প্রেয়সীকে বলা, ‘তোমার তুলনা তু্মিই’! পেয়ারার রয়েছে পাঁচটি বিশেষ গুণ যেমন; এটি ডায়াবেটিকসের জন্য উপকারী, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, চোখের জন্য ভালো, পেটের জন্য উপকারী, আর ক্যান্সার প্রতিরোধী।
৫. পৌরাণিক মতে সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, এবং কলি -এই চারটি কালপর্বে পৃথিবীতে অনেকটা জ্যামিতিক হারেই বেড়েছে মানুষ, কিন্তু সৎ মানুষ বাড়েনি তো। পরিমাণগতভাবে শিক্ষিতের হার বেড়েছে ঠিকই কিন্তু গুণগতভাবে সুশিক্ষায় জ্ঞানীর সংখ্যা বাড়েনি। আইন আইনজ্ঞ আইনের বিধি উপবিধি (by-law) ইত্যাদিও বেড়েছে বহুরূপে (কখনো যৌক্তিক কখনো বা অযৌক্তিক কারণে) কিন্তু অপরাধ কমেনি। বরং বিচারহীনতা বিচারকার্যে বিলম্ব ইত্যাদি নানাবিধ কারণে জট বেঁধে স্তূপাকার হয়ে আছে মামলার নথিপত্র। দেহ-সুন্দরী বা আচমকা-সুন্দরীর সংখ্যা এবং আধিক্য বেড়েছে ঢের বেশি, চরিত্র-সুন্দরী বাড়েনি মোটের উপর তার। খাদ্যদ্রব্যের পরিমাণ বেড়েছে কিন্তু খাদ্যদ্রব্যের গুণাগুণ বাড়েনি। শিক্ষক বেড়েছে অগণিত, শিক্ষকদের নীতিজ্ঞান এবং জীবনবোধ বাড়েনি মোটেই। নেতা-নেত্রীর সংখ্যা বেড়েছে, নীতিবোধ বাড়েনি। এখানে কেবল এটুকুই বলতে চাই যে, নিজের দোষাবহ অভ্যাস সম্পর্কে সদা সচেতন থেকে দোষগুলো বদলানোই উচিত। সেটা অন্য কারোর জন্য না হলেও নিদানপক্ষে নিজের জন্য হওয়াটাই বাঞ্ছনীয়। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এবং উপমহাদেশের খ্যাতনামা বিজ্ঞানী প্রয়াত ড. এপিজে আবদুল কালাম-জির উক্তি, ‘তুমি তোমার ভবিষ্যৎ পাল্টাতে পারবে না কিন্তু তুমি চাইলে তোমার অভ্যাস পাল্টাতে পারো, এবং নিশ্চিতভাবে তোমার অভ্যাস ভবিষ্যৎ পাল্টে দিবে।’
সুধীজন, আরো খানিক সময় না হয় আপনাদের থেকে ধার হিসেবে চেয়েই নেই। আর বলতে চাচ্ছি যে :
৬. ভববন্ধনের মানুষজন নিজেদের মধ্যে বিচরণশীল কপট কিংবা ধূর্ত গুরুর দ্বারা আবিষ্ট হয়ে মনগড়া প্রবৃত্তিগুলোর কুপ্রভাবে সদা দুষ্ট। নিজেদের প্রয়োজনে মুক্তির অন্বেষণ করতে এর থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে মানুষজনকে। দীর্ঘদিনের কুপ্রবৃত্তি স্বভাব পরিবর্তন কাজটি নিঃসন্দেহে জটিল তয় অসম্ভব নয়। কেননা স্রষ্টার মহিমা থেকে মানুষের মধ্যে বিকিরিত যে শক্তি তার সঙ্গে মানুষজন ভালোভাবে পরিচিত হয়ে নিবিষ্ট মনে অনুশীলন (বুদ্ধির চাষ বা মগজের চাষ) করার কাজই কেবল পারে উক্ত জটিলতা নিরসন করতে। সেইসাথে প্রকৃতি এবং প্রকৃতিজাত পরিমন্ডলের কটিদেশে অবস্থানুসারে ব্যস্ত সময় পার করায় মনোযোগী হলে এই ভবেই মানুষজন নিজেদের জন্য কল্যাণ ও শান্তি প্রতিষ্ঠা সুনিশ্চিত করতে পারে। জনৈক আত্মদ্রষ্টার উক্তি, ‘জীবনে একা থাকারও দরকার আছে, নিজের সাথে কথা বলে অনেক কিছু শেখা যায়’। চরিত্র গঠন, জীবনের মানোন্নয়ন, নীতি বোধ ও উচ্চ আদর্শের অনুসারী হয়ে নিজেকে আদর্শ হওয়ার যোগ্য করে তোলা। অতঃপর পরিবার সমাজ রাষ্ট্র তথা বিশ্বময় মানব কল্যাণে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করাই মানুষজনের ধর্মকর্ম হওয়া বাঞ্ছনীয়। সবাইকে জানতেই হবে স্বল্পজীবী ব্যক্তিমানুষের এই পার্থিব চিন্তারাজ্যের কথা। কে আমি, কেন আমি, কোথায় আমি, কী করণীয়, কী জন্যই বা করণীয়, কখন করণীয় ‘নো দ্যা সেলফ’ ইত্যাদি স্বীয় জীবনসম্বন্ধীয় আত্মজিজ্ঞাসায় আত্মার স্বরূপ সম্পর্কে জ্ঞাত হতেই হবে সদা এই ভবভার বহনকারী মানুষজনকে। অন্যথায় স্বর্ণসুযোগ অতিক্রমণ হবে একদা ঠিকই কিন্তু কাজের কাজ অর্থাৎ মানবদেহ নামক স্বর্ণপিঞ্জরে জ্ঞানবিজ্ঞান ও বুদ্ধির চাষবাসের চর্চা বাকি পড়ে থাকবে। এমনটাই হয়ে আসছে দীর্ঘকাল যাবৎ। আমাদের অতীতবিধুরতা এমনি সাক্ষ্যদান করে যে, বার্ধক্যজনিত গন্তব্যে উপস্থিত হয়ে মানুষজনের কেবল পশ্চাত্তাপ করা ব্যতিরেকে আর কিছুই করার থাকে না। তাই হয়তো উচ্চ মার্গণ জনৈক গায়ক দার্শনিক জমিরূপে কল্পিত মানুষকে উদ্দেশ করে গেয়েছেন, ‘এমন মানবজমিন রইল পতিত আবাদ করলে ফলতো সোনা, মন-রে কৃষি কাজ জানো না’।
৭. * বাস্তব বড়ো কঠিন, তবুও মানুষকে মেনে নিতে হয়। জীবন এত জটিল, তবুও মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়। ভালোবাসা বড়ো কষ্টের, তবুও মানুষকে ভালোবাসতে হয়। পৃথিবী এত মায়ার, তবুও তাকে ছেড়ে যেতে হয়। মৃত্যু এত যন্ত্রণার, তবুও তাকে বরণ করতে হয়। ** ভরসা করার মতো মানুষ পাওয়াটা আজকাল ভাগ্যের ব্যাপার, মানুষ নামের মানুষ ঠিকই আছে, কিন্তু বিশ্বাস করার মতো মানুষের বড়ো অভাব। *** আমি চেষ্টা করি জীবনের প্রতিটা সময় সবার সাথে ভালো করে কাটাতে, কারণ আমি সারাজীবন বাঁচবো না, কিন্তু আমার স্মৃতিগুলো সারাজীবন মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকবে। **** জীবনে কাউকে আঘাত করার আগে একটু ভেবে নেবে, নিজে আঘাত পেলে কেমন লাগে? মনে রাখা উচিত জীবনে কাউকে কাঁদিয়ে বেশিদিন ভালো থাকা যায় না। ***** মৃত্যু যে শুধু দেহের তা কিন্তু নয়, বরং আসল মৃত্যু মনের। একটা মনের যদি মৃত্যু হয়, তারপর যা অবশিষ্ট থাকে সেটা জীবন্ত লাশ। ইত্যাদি সব জনৈক বিদুষী বিদ্যানিধি ও মনীষীদের উক্তিগুলো আমাদের জগৎসংসারের কল্যাণে ও জীবনমানের উন্নয়নে পথ এবং পাথেয় হয়ে থাক -এমনতর শুভকামনা সবার জন্য।
কাউকে বেশি ভালোবাসার দরকার নেই, প্রধানত নিজেকে ভালোভাবে জানাশোনা করা ও যতটা সম্ভব নিজেকে ভালোবাসা, তয়ই কেবল মনোজগতের মানুষজনকে জানাজানির পথ সুগম হবে। বেশি বা কম এসব আন্যালসিসের প্রয়োজন কী, কেননা বেশি আন্যালসিস কখনো কখনো পার্যাশলসিসে পর্যবসিত হয়। স্বামী বিবেকানন্দ-জির অমোঘ উক্তি, ‘জীবনে বেশি সম্পর্কের প্রয়োজন নেই, কিন্তু যে সম্পর্কগুলো আছে তাতে জীবন থাকা অত্যন্ত জরুরি’।
৮. মানবীয় গুণাবলীর অধিকারী মানুষ আবেগপ্রবণ জাতি হিসেবে চিহ্নিত। পরিবেশ প্রতিবেশে আজ অনুচিতই যেন উচিতে পর্যবশিত হয়েছে।
সুধীজন, এখানে আরো কিছু কথা না বললেই নয়, আর তা হচ্ছে :
৯. মানবদেহ এক অপূর্ব সৃষ্টি। এত চমৎকার, বুদ্ধিমান, সৃজনশীল ও সংবেদনশীল সৃষ্টি এই মহাবিশ্বে আর কোনো সৃষ্টির অস্তিত্ব এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। মানবদেহে প্রতিটি কোষে খাবার পৌঁছানোর জন্যে রয়েছে ৬০ হাজার মাইল পাইপলাইন। রয়েছে ফুসফুসের মতো রক্ত শোধনাগার। হার্টের মতো শক্তিশালী পাম্প যা মানুষের জীবদ্দশায় সাড়ে ৪ কোটি গ্যালনেরও বেশি রক্ত পাম্প করে। রয়েছে চোখের মতো ছোট্ট লেন্স যা দিয়ে এই মহাবিশ্বের সবকিছু দেখা যায়। আর এই দেহের কার্যক্রম পরিচালনার জন্যে রয়েছে সার্কুলেটরি, নার্ভাস, এন্ডোক্রাইন ও ইমিউন সিস্টেমের মতো অগণিত সিস্টেম। তাই সব মানবদেহের মধ্যে সুস্থ থাকার ক্ষমতা রয়েছে (সুস্থতা স্বাভাবিক; অসুস্থতা অস্বাভাবিক)। আজ অবধি কেউ একথা বলেননি যে, রোগগ্রস্ত হওয়া প্রয়োজন। বরং সত্য হচ্ছে সকলেই চায় সুস্থতা। প্রত্যহ কোটি কোটি মানুষ ভাইরাস, ব্যাক্টেরিয়া, এলার্জেন, ফাঙ্গি ইত্যাদির মুখোমুখি হচ্ছে। তয় এর অতি ক্ষুদ্রাংশই রোগ পর্যন্ত গড়ায়। দৈহিক প্রতিরোধ ক্ষমতা ছাড়াও মানুষজনের রোগের বিরুদ্ধে প্রত্যেকেরই মানসিক প্রতিরোধ ক্ষমতা রয়েছে। যারা রোগ নিয়ে অহেতুক দুশ্চিন্তায় ভোগে তারা সহজেই রোগাক্রান্ত হয়। আর যারা ব্যস্ত (রোগ নিয়ে ভাবার সময় পায় না), তাদের মোটের ওপর স্বাস্থ্য অনেক ভালো থাকে। এটাও ঠিক যে, মানবদেহ অপূর্ব সৃষ্টি হলেও বহতা নদীর মতোই মানবদেহের প্রতিটি পরমাণু পরিবর্তিত হচ্ছে। ক্যালিফোর্নিয়ার ওকরিজ ল্যাবরেটরিতে রেডিও আইসোটোপ পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, মানবদেহের ৯৮ শতাংশ পরমাণু প্রতিবছর পরিবর্তিত হয়। আর এই পরিবর্তন নিয়ন্ত্রিত হয় ডিএনএ-তে বিদ্যমান জেনেটিক কোড দ্বারা, দেহ-মন প্রক্রিয়ার কোয়ান্টাম লেভেল থেকে। মানবদেহের ৯৮ শতাংশ বস্তু প্রতিবছর পরিবর্তিত হওয়ার পরও রোগ বিশেষত ক্রনিক রোগ রয়ে যাওয়ার কারণ একটাই, তা হচ্ছে বস্তু পরিবর্তিত হলেও তথ্য অর্থাৎ ডিএনএ-র প্রোগ্রামিং অপরিবর্তিত রয়ে যায়। তাই নতুন বস্তুও পুরনো তথ্য দ্বারাই পরিচালিত হয়। দেহ-মন নিয়ন্ত্রণকারী তথ্যভাণ্ডারের পুনর্বিন্যাস (To change the printout of the body, someone should learn to rewrite the software of mind) পরিপূর্ণ সুস্থতার জন্যে খুবই প্রয়োজন। তথ্যের পুনর্বিন্যাস হলেই মানবদেহ নিজেই নিজেকে রোগমুক্ত করতে পারে। কারণ চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা দীর্ঘ গবেষণার পর বলেছেন, ‘মন সেরা ডাক্তার, আর মানবদেহ সবচেয়ে সেরা ফার্মেসি’। যেকোনো ওষুধ কোম্পানির চেয়ে মানবদেহ বেশি ভালোভাবে পেইনকিলার, ট্রাঙ্কুইলাইজার, এন্টিবায়োটিক প্রভৃতি তৈরি করতে এবং যথাসময়ে সঠিক মাত্রায় তা ব্যবহার করতে পারে। ওষুধ যে রোগ নিরাময় করতে ব্যর্থ হয়েছে, মনের শক্তি দিয়ে সে রোগ নিরাময় হতে পারে। আর দীর্ঘ গবেষণার পর চিকিৎসাবিজ্ঞানীরাও এখন স্বীকার করতে শুরু করেছেন যে, রোগের কারণ যেমন দৈহিক হতে পারে তেমনি হতে পারে মানসিক। এই মানসিক বহু জটিল রোগ এমনকি ক্যান্সারের কারণও হতে পারে। মার্কিন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ক্রিচটন দীর্ঘ গবেষণার পর দেখিয়েছেন যে, হৃদরোগের কারণ প্রধানত মানসিক। তিনি বলেছেন, কোলেস্টেরল বা চর্বি জাতীয় পদার্থ জমে করোনারি আর্টারিকে প্রায় ব্লক করে ফেললেই যে হার্ট অ্যাটাক হবে, এমন কোনো কথা নেই।
১০. বেল ও পেয়ারাসহ শজনে, নিম, তুলসী ও লেবু প্রসঙ্গে থিয়োসফি গ্রন্থে ছয়টি পৃথক প্রবন্ধে বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। উদ্ভিদগুলোর পুষ্টি ও ভেষজ গুণসহ নানা রোগের প্রতিষেধক সম্পর্কেও বর্ণনা রয়েছে থিয়োসফি গ্রন্থে। যেমন; ক. ‘ত্রিপত্রক বৃক্ষের তেলেসমাতি’ শিরোনামে গ্রন্থের ২৮৪ পৃষ্ঠায় বেল, খ. ‘ভিটামিন ও ভেষজ যুগলবন্ধি’ শিরোনামে গ্রন্থের ২৯৪ পৃষ্ঠায় পেয়ারা, গ. ‘শজনে ফুলে সজনি খুশি’ শিরোনামে গ্রন্থের ২৫৩ পৃষ্ঠায় শজনে, ঘ. ‘প্রতিষেধক নাকি উপশম’ শিরোনামে গ্রন্থের ২৫১ পৃষ্ঠায় নিম, ঙ. ‘তুলসীবনের বাঘ..!!’ শিরোনামে গ্রন্থের ২৭৪ পৃষ্ঠায় তুলসী, চ. ‘যৌবনে ও কান্তিতে নিম্বু’ শিরোনামে গ্রন্থের ৩০২ পৃষ্ঠায় লেবু।
১১. আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম-জি’র ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে বিভিন্ন সময় নানারকমের অভিযোগ উঠেছে। নজরুল-জি অসংখ্য হামদ-নাত লিখেছেন। সেই সাথে হিন্দু ধর্ম নিয়ে অসংখ্য কবিতা, গান লিখেছেন। তাই অনেকে ঈর্ষা পোষণ করেন, উনি প্রকৃতই হিন্দু ধর্ম বিশ্বাস করতেন কিনা? ব্যক্তিবিশেষের ব্যাখ্যা নেয়ার আগে ঢের ভালো হয় নজরুল-জি এ বিষয়ে কী বলেছেন তা পর্যালোচনা করা। কেউ কোনো সাহিত্য রচনা করে থাকলে সে বিষয়ে তিনি কি বলেছেন, সেই ব্যাখ্যাই সর্বতোভাবে গ্রহণযোগ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। তয় ব্যাখ্যায় যদি প্রমাণিত হয় সেটা ইসলাম-বিরোধী তাহলে অবশ্যই সেটা ইসলাম-বিরোধী। নজরুল-জি স্বঘোষিত কাফের, মুরতাদ (ইসলামে অবিশ্বাসী) বা নাস্তিক ছিলেন কিনা! বরং তিনি নিজে সারা জীবন বলে গেছেন, আমি মুসলমান। জীবনে কখনও বলেননি আমি ধর্মনিরপেক্ষ, হিন্দু কিংবা অন্য কিছু। আমার ১০০তম লেখা ‘স্মৃতিতে চির অম্লান’ প্রবন্ধের বর্ণনায় নজরুল-জি তাঁর শেষ ভাষণে উল্লেখ করেন, ‘কেউ বলেন আমার বাণী যবন, কেউ বলেন কাফের। আমি বলি ও দুটোর কোনোটাই না। আমি শুধু হিন্দু মুসলিমকে এক জায়গায় ধরে নিয়ে হ্যান্ডশেক করানোর চেষ্টা করেছি, গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি।’
সুধীজন, এই বিশ্বচরাচরের অহর্নিশ বাস্তবতায় এমন অনেক বিষয় আছে যেসব এড়িয়ে যেতে চাইলেও সহসা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। এবারে বাস্তবধর্মী সেসব গুণকীর্তনের খানিক উল্লেখ করছি। তয় এসব শুনার পর সুধীজন, নিজগুণে আমাকে ক্ষমা করবেন এমনটাই আমার প্রার্থনীয় বটে ।
১২. তৈল চর্চার রসায়ন জানা প্রসঙ্গে আমার ১০১তম লেখা ‘স্তাবকের কথকবৃত্তি’ প্রবন্ধের আবির্ভাব অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী-জি তাঁর তৈল প্রবন্ধের শুরুর দিকে বলেছেন, ‘বাস্তবিকই তৈল সর্বশক্তিমান; যাহা বলের অসাধ্য, যাহা বিদ্যার অসাধ্য, যাহা ধনের অসাধ্য, যাহা কৌশলের অসাধ্য, তাহা কেবল তৈল দ্বারা সিদ্ধ হতে পারে। যে সর্বশক্তিমান তৈল ব্যবহার করতে জানে, সে সর্বশক্তিমান। তাদের কাছে জগতের সকল কাজই সোজা। তাহার চাকরির জন্য ভাবতে হয় না, উকিলের প্রসার লাভের জন্য সময় নষ্ট করতে হয় না, বিনা কাজে বসে থাকতে হয় না, কোনো কাজেই শিক্ষানবিশ থাকতে হয় না। যে তৈল দিতে পারে, তার বিদ্যা না থাকলেও সে প্রফেসর হতে পারে, আহাম্মক হলেও ম্যাজিস্ট্রেট হতে পারে, সাহস না থাকলেও সেনাপতি হতে পারে এবং দুর্লভ রাম হয়েও রাজ্যেশ্বর হতে পারে। তৈল নহিলে জগতের কোনো কার্য সিদ্ধি হয় না। তৈল নহিলে কল চলে না, প্রদীপ জ্বলে না, ব্যঞ্জন সুস্বাদু হয় না, চেহারা খোলে না, হাজার গুণ থাকুক তার পরিচয় পাওয়া যায় না, তৈল থাকিলে তার কিছুরই অভাব থাকে না। কিন্তু তৈল দিলেই হয় না। তৈল দিবার পাত্র আছে, সময় আছে, কৌশল আছে।’ হরপ্রসাদশাস্ত্রী-জি আরো লিখেছেন, ‘বাঙালির বল নাই, বিক্রম নাই, বিদ্যাও নাই। সুতরাং বাঙালির একমাত্র ভরসা তৈল। বাঙালির যে কেহ কিছু করেছেন, সকলেই তৈলের জোরে।’ তয় যারা তৈল মারে, যারা তোষামুদি করে তারা যে খারাপ মানুষ, এই ব্যাপারে অন্তত কারো কোনো দ্বিমত নেই। সমাজে এরা জঘন্য মানুষ হিসেবে বিবেচিত। একমাত্র ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের জন্যে তারা যে কোনো ধরনের অভিনয় করতে জানে। তারা নীতি-নৈতিকতার তোয়াক্কা করে না। তারা সবসময় মহাসংকট এবং ক্ষতিকারক। তোষামোদকারীদের ব্যাপারে রিচটার-জি বলেছেন, ‘মানুষ প্রশংসা করার তুলনায় তোষামোদ করা সহজ মনে করে’। এডমন্ড বার্ক-জি বলেছেন, ‘তোষামোদ, তোষামোদ গ্রহীতা ও তোষামোদকারী উভয়কেই কলুষিত করে’। জেনারেল অব্রিগন-জি বলেছেন, ‘আক্রমনকারী দুশমনকে ভয় পেয়ো না, তোষামোদকারী বন্ধুর কাছ থেকে নিজেকে অনেক দূরে সরিয়ে রাখো’। তোষামোদকারীর কোনো ধর্ম নেই। শয়তানের চরিত্রের বৈশিষ্ট্য তার চরিত্রে বিদ্যমান। তার চরিত্রে মুনাফেকির আলামত রয়েছে। তারা সুবিধাবাদী চরিত্রের লোক, তাদের থেকে যত দূরে থাকা যায় ততই মঙ্গল। ওই লেখারই অন্তরন অধ্যায়ের প্রথম দিকের উল্লেখ মতে, তৈল চর্চার রসায়ন জানতে জাতীয় কবি কাজী নজরুল-জির অমোঘ কবিতা ‘মোসাহেব’ মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। কবিতাটা যদিও আমাদের প্রায় সকলেরই জানা, তবুও তৈরি সূত্র হিসেবে এখানে খানিক বলা যায় বইকি। ‘সাহেব কহেন: চমৎকার, সে চমৎকার। মোসাহেব বলে: চমৎকার সে হতেই হবে যে, হুজুরের মতে অমত কার? সাহেব কহেন: কি চমৎকার, বলেতেই দাও, আহা হা! মোসাহেব বলে: হুজুরের কথা শুনেই বুঝেছি, বাহা হা বাহা হা বাহা হা! …‘
১৩. অপরদিকে সমাজকল্যাণের উপায় হিসেবে বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ-জি গ্রামোন্নয়ন ও গ্রামের দরিদ্র মানুষজনকে শিক্ষিত করে তোলার পক্ষে মত প্রকাশ করেন। পাশাপাশি সামাজিক ভেদাভেদ, অস্পৃশ্যতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধেও তিনি তীব্র প্রতিবাদ জানান। রবীন্দ্রনাথ-জির দর্শনচেতনায় ঈশ্বরের মূল হিসেবে মানব সংসারকেই নির্দিষ্ট করা হয়। তিনি দেববিগ্রহের পরিবর্তে কর্মী, অর্থাৎ মানুষ ঈশ্বরের পূজার কথা বলেন।
সুধীজন, আমার নাতিদীর্ঘ বক্তব্যের শেষ প্রান্তে উপনীত প্রায়। নিরাময়ে ডাক্তার, ড্রাগস্টোর বা হাসপাতালের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞান অ্যানথ্রোপোলোজিকাল মেডিসিন হিসেবে ট্যাবলেট, ক্যাপসুল বা ইনজেকশন -এর প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রথমে পরীক্ষানিরীক্ষা করে তারপর চূড়ান্ত প্রডাক্ট তৈরি করা হয়। এসবে মিশানো রাসায়নিক বা বিষক্রিয়ার মাত্রা ও কার্যক্ষমতা পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য যথেচ্ছভাবে প্রয়োগ করা হয় বানর, ইঁদুর, কুকুর, বিড়াল প্রভৃতি প্রাণীর দেহে। তয় ‘অ্যানথ্রোপোসোফিকাল মেডিসিন’ নিয়ে আমার গবেষণা বহুলাংশে স্টাডি নির্ভর। কিন্তু এর পরীক্ষানিরীক্ষার প্রয়োগ আমি সবটাই করি সরাসরি নিজের জীবনযাপনে। নীরিহ প্রাণী মেরে কী লাভ, বরং মরলে নিজেই মরি, ক্ষতি যা হওয়ার নিজেরই হোক। এই বিশ্বাস ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কে এখানে অল্পস্বল্প করে আপনাদের উদ্দেশে জানাচ্ছি :
১৪. প্রকৃতিজ শজনে, নিম, তুলসী, পেয়ারা, বেল এবং লেবু -এই ছয়টি উদ্ভিদের পুষ্টি ও ভেষজগুণে ভরপুর পাতার ককটেল রস বিগত তিন বছর যাবৎ প্রতিদিন দু’বেলা করে আমি নিজে নিয়মিত সেবন ক

রছি। এ চর্চার মাধ্যমে বাস্তব অভিজ্ঞতাও সঞ্চয় করেছি অনেক। তিন বছর আগে পর্যন্ত নিয়মিত বিরতি দিয়ে চোখ, দাঁতসহ অন্যান্য ডাক্তার এবং ওষুধের উপর নির্ভর করতে হতো আমাকে। কিন্তু এখন কোনো ডাক্তারের কাছে যাই না বা কোনো ওষুধ আমি সেবন করি না। বরং প্রকৃতিজ এইসব পাতালতা খেয়ে আমি ঢের ভালো আছি। পুরানো রোগভোগ আমায় ছেড়ে সেই কবেই পালিয়েছে! গবেষণা লব্ধ জ্ঞান মতে কোনো রোগ নতুন করে আমার দেহে আর বাসা বাঁধতে পারবে না! এইসব পাতার রস সেবন, পরিমিত খাদ্যাভ্যাস, সাথে যোগব্যায়াম ও যোগাসন সমন্বয়ে এক প্যাকেজ চর্চা আমাকে সুস্থ এবং নিরাপদ রাথতে যারপরনাই সাহায্য করছে। বেশি দিন বাঁচা বা মৃত্যুর সাথে আপস (মনিবের ক্ষতি করিয়া আপস করিয়াছে, -রবীন্দ্র.) করে বেঁচে থাকা আমার কাম্য নয়। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার জন্যে আমি সদা প্রস্তুত। তয় যত দিন বাঁচবো সুস্থতা নিয়েই বাঁচবো -এটি আমার শক্তি। ধন্বন্তরী ডাক্তার বা চিকিৎসাব্যবস্থা থেকে যথাসম্ভব নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে এ বিশ্বচরাচরে বসবাস থাকবে আমার। প্রসঙ্গত উল্লেখ করছি, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ-জিও নিয়মিত নিমজল সেবন করতেন। এ নিয়ে বহু মজার গল্পও রয়েছে।
১৫. জীবনদর্শনমূলক এমন অনেক বিষয়বস্তুর সংকলনে গ্রন্থ ‘থিয়োসফি’ আজ এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। আপনারা গ্রন্থখানি পড়ে ও বাস্তবে চর্চা করে উপকৃত হবেন এমনই আবেদন আমার। প্রকৃতি ও প্রকৃতিজ বিষয়বস্তুকে সাথে নিয়ে নিজে বাঁচুন আর জগদবাসীকে বাঁচান – এমনই এক আমাদের প্রত্যয়।
বিদ্যানিধিগণ বলেন, বিত্ত বৈভব মানুষের শান্তির পথ বা পাথেয় নয়, কেননা এদের আজীবন পাহার দিতে হয়। তয় জ্ঞানই মানুষের প্রকৃত শান্তি, কেননা এটি স্বয়ং মানুষকে পাহারা দেয়। অনেক কষ্ট স্বীকার করে, মূল্যবান সময় দিয়ে এই অনুষ্ঠানকে সুষমাময় করেছেন এ জন্য আমি কৃতজ্ঞ। সবার জন্য আমার হৃদয়জ শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ। – – ০৭.২.২০১৮ খ্রি.
