হাওড়ের সাসটেইনেবিলিটি!

ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব – জলজ বাস্তুসংস্থান ও মাছ শুধু নয় হাঁসও মারা পড়েছে ব্যাপকভাবে। এখন শুনা যাচ্ছে ছাগলও মরেছে। এমোনিয়ার গল্প ঠিক নয় বলেই মনে হচ্ছে, যেসব তথাকথিত ও মুখস্ত বিদ্যা নির্ভর এক্সপার্ট এমোনিয়ার ধোঁয়া তুলেছেন তারা কোন টেস্টের রেফারেন্স দিতে পারেন নাই। অর্থাৎ কোন কোন রেঞ্জে (পরিমাণ) এমোনিয়ার উৎপন্ন হলে জলজ প্রানী, উভচর প্রানী কিংবা চারণরত অবস্থায় ঘাস ও পানি পান করা প্রানির কোনটি মারা যাবে, এমন তথ্য কেউ দিতে পারেননি। এত দ্রুততার সাথে পরীক্ষা নিরীক্ষা না করেই এমনিয়া গ্যাস, ভারী ধাতুর উপস্থিতি এবং তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে মন্তব্য করে সফস্টিকেটেড ব্যাপারটাকে আড়াল করতে চাইছে মেইন স্ট্রীম মিডিয়া। এটা সরকারকে বা প্রশাসনকে রক্ষার ব্যাপার না, এটা দেশের প্রাণ-পরিবেশ- জীব বৈচিত্র ও মানুষ রক্ষার ব্যাপার, সরকারও যার অংশ! আমরা সীমান্ত সংলগ্ন জলা ভূমির পানিতে ভারী ধাতুর উপস্থিতির সুস্পষ্ট এবং বিশদ পরীক্ষা লভধ রিপোর্ট চাই।ব্যাকগ্রাউন্ড- বানের পানিতে ধান তলিয়ে যাবার ব্যাপার বাংলাদেশের জলা অঞ্চলে খুবই পরিচিত। এমোনিয়ার ব্যাপার তাই ষড়যন্ত্র। উল্লেখ্য উচ্চ ফলশীল ধান জাত হিসেবে হাওড়ে উফশী চালু হয়েছে যা দৈর্ঘে খর্বাক্রিতির। ফলে ফ্ল্যাশ ফ্ল্যাডে এই ধান সাস্টেইন করতে পারে না।
বিপরীতে বাংলাদেশের জলা ও হাওড়ে প্রাকৃতিক বোরো জাতের যে আবাদ ছিল সেটা পানির কিছু নিচে পড়লেও প্রাপ্ত স্বল্প সুর্যালোকে বেঁচে থাকে এবং দ্রুত পানির সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে।
অর্থাৎ এনভায়রনমেন্টের সাথে শত শত বছর ধরে সাস্টেইন করা ধান জাতকে উচ্ছন্নে ফেলে বাচবিচার ও জ্ঞানহীন ব্যবস্থাপনায় যেখানে সেখানে উফসী জাত চালু হয়েছে যা এখন সমূহ বিপদ ডেকে এনেছে।
এইধরনের অদুরদর্শী এবং নন টেকসই উন্নয়নের খপ্পরে পড়েছে বাংলাদেশ যুগে যুগে!
বাংলাদেশের উচিৎ সঠিক ব্যবস্থাপনার আয়োজন করাঃ
১। IAEA, WHO, UNESCO কে হাওড়ের প্রাণ বিপর্যয় সম্পর্কে জানানো দরকার।
যাতে -ক। উন্নত মানসম্পন্ন রাসায়নিক কন্টামিনেশন টেস্ট এরেঞ্জমেন্ট করা যায় (রেডিয়েশন এবং হাই পার্টিক্যাল এক্সিস্ট্যান্স)। যেহেতু খনির আকরিক তোলার কাজ চলছে, ধারনা করি দূষণ সূক্ষ্ম তথাপি দীর্ঘ মেয়াদে ভয়ানক হবে। বাংলাদেশকে পরিস্কার জানাতে হবে যে আমাদের এই ধরনের সফস্টিকেটেড টেস্ট ক্যাপাবিলিটি আছে কিনা। না থাকলে দ্রুত আন্তর্জাতিক সহায়তা নিতে হবে। খ। সম্ভাব্য রাসায়নিক দূষণ সম্পর্কে নিজেরা সতর্ক থেকে ভারতকে আন্তর্জাতিক ফ্রেইমোয়ার্কের মাধ্যমে সচেতন হতে বলা যায়। গ। দূষণ প্রমাণিত হলে, দায়ত্বহীন দূষণে খনির দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্পোরেট কোম্পানি ও ভারতীয় প্রশাসনকে ক্ষতিপূরণ দিতে চাপ দেয়া যেতে পারে।
২। আনবিক শক্তি কমিশনের রেডিয়েশন টেস্টের বাইরে হাই পার্টিক্যাল টেস্ট হওয়া দরকার। সেখাঙ্কার পানি, মরে যাওয়া জলজ প্রানী, পানির নিচের মাটি এবং বেঁচে যাওয়া প্রানীর শরীরে কি কি ভারী ধাতুর উপস্থিতি আছে তার পুর্নাঙ্গ রিপোর্ট দরকার।
৩। ভারতীয় সীমান্ত থেকে ক্রমান্বয়ে দেশের অভ্যন্তর ভাগের দিকে নির্দিস্ট দুরত্বে একাধিক লোকেশনের বিভিন্ন স্যাম্পল (পানি, শ্যাওলা, মরা ও জীবিত মাছ-হাস-ছাগল-ব্যাংগ,সাপ-পানির নিচের মাটি, কচুরিপানা) থেকে পরীক্ষা করতে হবে। এতে লোকেশন ভেদে ভারী ধাতুর উপস্থিতি এবং ক্রম বুঝা যাবে।
৪। মাছের বাইরেও অন্যান্য জিও প্ল্যাঙ্কেট, ফ্লোরা – ফাউনা অর্থাৎ জলজ বাস্তুসংস্থানের সমুদয় উপাদন গুলো কিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার রিপোর্ট দরকার। কেননা পানিতে মাছের খাদ্যাভ্যাস কিভাবে এফেক্টেড হচ্চে তা বের করে আনতে হবে।
৫। ভারতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে যেসব খনির কাজ হচ্ছে সেসবের পর্যাপ্ত তথ্য নিতে হবে। সেখান থেকে ঠিক কি কি খনিজ দূষণ বহন করে পানি প্রবাহিত হচ্ছে তার সুস্পষ্ট রিপোর্ট দরকার। উল্লেখ্য ভারত তার একেবারেই সীমান্তে উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে খনিজ আহরণ করে বাংলাদেশের বিপদ ডেকে আনবে, এতে অবাক হবার কিছু নেই, দেশটি কখনই আঞ্চলিক ও প্রতিবেশি দেশের প্রাণ-পরবেশের ব্যাপারে দায়িত্বশীল নয়।
সিলেট অঞ্চলের উজান এলাকা হচ্ছে ভারতের উত্তরপূর্ব এলাকা। সেখানে পরিবেশ বিধ্বংসী কোনো কার্যক্রম চললে ভাটি তথা সিলেট বিভাগে ক্ষতিকর প্রভাব সবার আগে পড়বে।কয়লা ও ইউরেনিয়াম খনি থেকে নিগর্ত এসিডে মেঘালয়ের বিভিন্ন নদীর দূষণের খবর পাওয়া গেছে, পানি বিবর্ণ হয়েছে, দূষণের কারনে সেখানে জলজ প্রাণীর মৃত্যুর অভিযোগও উঠেছে। সুতরাং সীমান্ত এলাকায় উন্মুক্ত খনি থেকে আকরিক আহরণের স্পর্শকাতর ব্যাপার দিল্লেতে সক্রিয় পরিবেশবাদী সঙ্ঘঠন গুলোকে আনুষ্ঠানিক ভাবে জানাতে হবে।
ডেইলি স্টারের বরাতে জানা যাচ্ছে- “The Department of Agriculture Extension (DAE) has made it clear that rotting of paddies under floodwaters cannot be the cause of deaths of aquatic resources, as it never happened after previous flash floods.” “Dr Bilkis Ara Begum, chief of chemistry unit at Bangladesh Atomic Energy Centre in Dhaka, said they were aware of the drilling for uranium extraction in the Khasi Hills. “It is very much possible that uranium-mixed water is coming down to our haors. If it happens, it would be disastrous for us,” said Bilkis.”
“বাংলাদেশের পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) গত বছর এপ্রিল মাসে সিলেটে একটি সেমিনারের আয়োজন করেছিল। ‘উত্তর-পূর্ব ভারতে অবাধ বৃক্ষ নিধন ও অপরিকল্পিত খনিজ আহরণে সুরমা অববাহিকায় ক্ষতিকর প্রভাব’ শিরোনাম ছিল সেমিনারের। সেখানে তুলে ধরা হয়েছিল, মেঘালয়ের নদীগুলোতে খনিজ আহরণের বিষাক্ত বর্জ্য মিশছে। সেসব নদীর পানি দূষিত হতে শুরু করেছে। মাছসহ অন্যান্য জলজপ্রাণী মারা যাচ্ছে। এই বিষাক্ত বর্জ্য বাংলাদেশের নদীগুলোতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। যার কিছু সারী, কংস, যাদুকাটা নদীর পানিতে পরিলক্ষিত হচ্ছে।”
বাংলাদেশের পরিবেশবাদী সঙ্ঘঠন গুলো মেগালয়ের রানিকোরের ইউরেনিয়াম খননের উন্মুক্ত পদ্ধতি নিয়ে ওয়াকিফহাল এবং তাঁরা যথাসময়ে উদ্বেগও জানিয়েছেন। সুতরাং বাংলাদেশের প্রশাসনকে দেখেও না দেখার ভান না করে এই ব্যাপারে অতিশয় দায়িত্বশীল হতে হবে।
বাঁধ ও হাওড় উন্নয়নের সাস্টেইনেবিলিটিঃ ৬। হাওড়ে যেন তেন ভাবে বাঁধ দেয়া হলেই বিপদ কেটে যাবে না। এটা সবার বুঝা দরকার। “পুরো উত্তর-পূর্ব ভারতের বাংলাদেশ সীমান্তের প্রাকৃতিক বনভূমি বিনাশ করে ভারত বহুজাতিক খনি প্রকল্প তৈরি করেছে। মেঘালয় পাহাড় আজ কয়লা আর চুনাপাথর তুলতে তুলতে ফাঁপা হয়ে গেছে। অল্প বিস্তর বৃষ্টিতেই আজ মেঘালয় পাহাড় ভেঙে পড়ছে বাংলাদেশের হাওড়ে।
(ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব, সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট একটিভিস্ট, faiz.taiyeb@gmail.com, প্রকৌশলী,ইইই,বুয়েট। টেকনিক্যাল আর্কিটেক্ট, ভোডাফোন নেদারল্যান্ডস; সাবেক টেলিকম সলিউশন আর্কিটেক্ট, এরিকসন (নাইজেরিয়া, ঘানা, দক্ষিণ কোরিয়া, নেদারল্যান্ডস); কোর নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ার, একটেল এবং অ্যালকাটেল-লুসেন্ট বাংলাদেশ।)